
নজরুল ইসলাম যশোর প্রতিনিধি: যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জহুরপুর গ্রামের কৃতী সন্তান শামস-উল-হুদা কেবল একজন ক্রীড়া সংগঠকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর অসামান্য অবদান যশোরের ক্রীড়াঙ্গনকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও রেখে গেছে স্থায়ী ছাপ। কর্ম, সততা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি আজও যশোরবাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন।১৯১৮ সালে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শামস-উল-হুদা। তাঁর পিতা শেখ আবুল বারী যশোর সিভিল কোর্টে কর্মরত ছিলেন এবং মাতা মোছাম্মৎ আশরাফুন নেছা ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই তিনি দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও সমাজসেবার শিক্ষা লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে। পরে যশোর জেলা স্কুল ও কালিগঞ্জ হাটপুল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর যশোর সরকারি এম.এম. কলেজ থেকে আইএ ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। বিশেষ করে ফুটবলে গোলরক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনের ফুটবল দলে খেলার মাধ্যমে তাঁর ক্রীড়া জীবন শুরু হয়। পরে চিত্তরঞ্জন ক্লাব, টাউন ক্লাব, ইয়ং মুসলিম ক্লাব ও যতীন্দ্র মোহন ক্লাবের হয়ে যশোর লিগে সুনামের সঙ্গে খেলেন। আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় অল বেঙ্গল দলের হয়ে শিরোপাও অর্জন করেন। খেলোয়াড়ের পাশাপাশি দক্ষ রেফারি হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
কর্মজীবনে তিনি খুলনা মুসলিম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করেন। জনসেবার প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে দীর্ঘদিন যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। রাজনৈতিকভাবে তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও মানবিক মূল্যবোধকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সর্বমহলে শ্রদ্ধা অর্জন করেন।যশোরের ক্রীড়া উন্নয়নে শামস-উল-হুদার অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা ৩৬ বছর তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে জেলার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।
১৯৫৯ সালে যশোর স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় ক্রীড়া সংস্থার আর্থিক সংকট ছিল চরম। তখন নিজের পৈতৃক বাড়ি থেকে ইট এনে স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণে সহযোগিতা করেন এবং নিজের অর্থ ব্যয়ে স্টেডিয়ামের চারপাশে টিনের বেড়া ও পরবর্তীতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেন। ক্রীড়ার প্রতি তাঁর এই আত্মত্যাগ আজও যশোরবাসীর কাছে অনুকরণীয় উদাহরণ।তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), টেবিল টেনিস ও অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের ফলেই ১৯৭৬ সালে যশোর জেলা দল জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
ক্রীড়ার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি যশোরের এন.এম. খান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া মাহমুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, উপশহর কলেজ, যশোর রেলওয়ে মহিলা কলেজ, নব কিশলয় কিন্ডারগার্টেন, মোমিন গার্লস স্কুল ও যশোর আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে যশোর ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, রেডক্রস, বিএভিএস (BAVS) ও পরিবার পরিকল্পনা সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭-৭৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাঁকে শ্রেষ্ঠ জাতীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সম্মানিত করে। ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পরের বছর, ১৯৮৮ সালে, যশোরবাসীর সর্বসম্মত দাবির প্রেক্ষিতে যশোর স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘যশোর শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম’। এছাড়া ২০১১ সালে হামিদপুরে প্রতিষ্ঠিত শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি তাঁর আদর্শ ও অবদানকে ধারণ করে দেশের প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ, সততা ও আত্মত্যাগ আজও যশোরের ক্রীড়াঙ্গন, শিক্ষা ও সমাজসেবার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বাঘারপাড়ার জহুরপুর গ্রামের এই কৃতী সন্তান প্রমাণ করে গেছেন—একজন মানুষের নিষ্ঠা, সততা ও জনকল্যাণের মানসিকতা একটি জনপদকে বদলে দিতে পারে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।