
এম ফয়জুল ইসলাম ফয়সাল, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ হরিলুটের মহোৎসব চলছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) জহিরুল ইসলাম। টিআর, কাবিখা ও কাবিটার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো থেকে সরাসরি ২০ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন “মিস্টার ২০ পার্সেন্ট” নামে পরিচিতি পেয়েছেন।
প্রকল্পের পাহাড়, দুর্নীতির মহাসাগর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে মুরাদনগর উপজেলার জন্য টিআর খাতে দেড় কোটি এবং কাবিটা খাতে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। এছাড়া কাবিখা কর্মসূচির আওতায় ১২৩ টন চাল ও ১২৩ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দের বিপরীতে মোট ১৮৮টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, ভ্যাট ও আইটিমুক্ত এসব প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে পিআইও জহিরুল ইসলাম সরাসরি ২০ শতাংশ হারে কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন। কাজের মান যাচাইয়ের পরিবর্তে তার মূল মনোযোগ থাকে কমিশনের অংকের দিকে। ফলে উপজেলার অধিকাংশ প্রকল্পেই নিম্নমানের কাজ হচ্ছে বলে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। দৌলবারী রাস্তা সলিং: ৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম টাকা কাজে ব্যয় হয়েছে। উপজেলা কমপ্লেক্সের জলাবদ্ধতা নিরসন: ৫ লাখ ৫০ হাজার ২৮২ টাকার এই প্রকল্পে মাটি ভরাটের নামে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। কাবিখা প্রকল্প: বি-চাপিতলা ও ভুতাইল এলাকায় রাস্তা পুনঃনির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত চাল ও গমের বিপরীতে নামমাত্র কাজ করে সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন এই কর্মকর্তা। বাঙ্গরা পশ্চিম ইউপি চেয়ারম্যান বাহার খান বলেন, “পিআইও তার ইচ্ছামতো কমিশন কেটে রেখে আমাদের বিল দিচ্ছেন।” পূর্বধর পশ্চিম ইউপি চেয়ারম্যান রহিম পারভেজ সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে এক প্রকার অসহায়। পিআইওকে ২০% কমিশন না দিলে তিনি বিলের ছাড়পত্রই দেন না।” একই ধরণের অভিযোগ করেছেন জাহাপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ সওকত আহমেদও।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে পিআইও জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি কোনো প্রকল্প থেকে ঘুস নিই না। অভিযোগগুলো সঠিক নয়।”
তবে বিষয়টি নিয়ে কড়া অবস্থান জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, “টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে আমরা তথ্য নিচ্ছি। পিআইওর বিরুদ্ধে কমিশনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দ্বিতীয় ফেইজের প্রকল্পের তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে এই কর্মকর্তা কর্মস্থল ত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন অনতিবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতির অবসান ঘটান।