
জিএম মাকছুদুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ১নং বড়শালঘর ইউনিয়ন এবং ৪নং সুবিল ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে চলছে অবৈধ ড্রেজার কার্যক্রম। প্রশাসনের অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি এসব বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ— এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ড্রেজার ব্যবসা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবেশ, কৃষিজমি, জলাধার এবং জনজীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ১নং বড়শালঘর ইউনিয়নের প্রজাপতি পশ্চিম পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ড্রেজার পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি পরিচালনা করছেন শাকিল ইসলাম বাকি, যিনি আওয়ামী লীগের দোসর ও সাবেক এমপি রাজি মোহাম্মদ ফখরুলের অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর ধরে এই ড্রেজারটি দিয়ে দিনের পর দিন বিরামহীনভাবে বালু-মাটি উত্তোলন চলছে। এর ফলে আশপাশের রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে, ভারী যানবাহনের চলাচলে গ্রামীণ সড়কগুলো নষ্ট হয়ে পড়ছে। কৃষিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা, জমির পাড় ধসে যাচ্ছে এবং বসতবাড়িগুলোতে তৈরি হচ্ছে ধ্বসের শঙ্কা। একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, “মাটি তুলে নিয়ে যাওয়ায় আমাদের জমির পাশের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়েছে। বীজতলা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অভিযোগ করলেও স্থায়ী সমাধান পাই না।” ৪নং সুবিল ইউনিয়নের বুড়িরপার এলাকায়, মেঘনের বাড়ির উত্তর পাশে খোরশেদ আলম ডিলারের মালিকানাধীন একটি ড্রেজারেও একই চিত্র। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও তা ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর আবারও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয় ড্রেজারটি।সেখানে বসবাসকারীরা অভিযোগ করেন—দিন-রাত বালু উত্তোলনের শব্দ, কম্পন ও যানবাহনের চলাচলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ড্রেজারপয়েন্টের পাশে ছোট-বড় জলাধারগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রামের জলধারায় সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষতিকর পরিবর্তন। একজন স্থানীয় যুবক বলেন, “প্রশাসনের অভিযান হয়, ছবি-ভিডিও হয়, কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা হয় না। কয়েকদিন পরে আবার আগের মতোই শুরু হয় পুরো কার্যক্রম।” দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অভিযোগ— প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘নীরব সমর্থন’ এবং মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না। সাময়িক অভিযান হলেও ড্রেজার মালিকেরা দ্রুতই আবার আগের রূপে ফিরে যায়। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান না থাকায় স্থানীয়রা প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে—নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হয়, জমি ও বাড়িঘর ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে, পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, মাছসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেবিদ্বারের সাধারণ জনগণ আশঙ্কা করছেন, সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সামনে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এলাকার সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, সাময়িক অভিযান নয়—প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, ড্রেজার জব্দ এবং মাঠপর্যায়ে স্থায়ী নজরদারিই হতে পারে স্থায়ী সমাধান। দেবিদ্বারের দুই ইউনিয়নে অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্য এখন শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়—এটি পরিবেশ, কৃষি এবং জনস্বার্থের জন্য গুরুতর হুমকি। প্রশাসনের দৃঢ় ও পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।