
আজগর সালেহী, চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নারী শিক্ষার্থীকে দারোয়ানের শারীরিক হেনস্তা কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী ও জোবরা এলাকার স্থানীয়রা। দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন গুরুতর আহত সহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, গুরুতর অবস্থায় অনেককে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন বিকেল ৩টায় জোবরা গ্রামে ১৪৪ ধারা জারি করেছে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে রবিবারের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে।
জানা যায়, শনিবার মধ্য রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী আবাসিকের ভাড়া বাসায় গেইট বন্ধ পেয়ে ডাকাডাকি করার পর দরোয়ান ঐ নারী শিক্ষার্থীকে অশ্লীল গালমন্দের একপর্যায়ে দারোয়ান ওই শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে আসে এবং অভিযুক্ত দারোয়ানকে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করে। কিন্তু সে পালিয়ে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা তাকে ধরার পর স্থানীয় কয়েকজন তাকে ছিনিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজসহ কয়েকজন আহত হন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘটনার সময় প্রক্টরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এর মধ্যে স্থানীয়রা মাইকিং করে গ্রাম থেকে লোকজন জড়ো করে লাঠিসোটা, দা, রামদা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, স্থানীয় সড়ক ও ধান ক্ষেতে লুঙ্গি পড়া কিছু লোকজন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে উপর্যপুরী আঘাত করছে।
সকাল থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বভাবিক দেখা গেলেও রোববার দুপুর ১টার দিকে ফের ক্যাম্পাসসংলগ্ন জোবরা গ্রামে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের ভাড়া বাসায় হামলা চালায় এবং এসময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। সংঘর্ষে চবির সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রো-ভিসি অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য ও সাংবাদিকরাও আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও বিকাল পর্যন্ত পুরো এলাকা উত্তেজনাপূর্ণ থাকে।
নিউজ লেখা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষে আহত হয়ে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। অনেকে রক্তক্ষরণে শয্যাশায়ী, কারও মাথায় ও হাতে গুরুতর আঘাত রয়েছে। আহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সেবিকা না থাকায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলছে, প্রতিদিন চবিতে কোনো না কোনো নিয়োগ হলেও আগের মতো স্থানীয়দের আর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এতে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমে আছে। তারা বিভিন্ন সমিতির মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে মিটিং করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। এরই সুযোগ নিয়ে কিছু প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ফন্দি আঁটছেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, পূর্বেও ফতেয়াবাদ স্টেশন এলাকায় হঠাৎ করে শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বা হঠাৎ উত্তেজনা সৃষ্টি করা হতো। কিন্তু পরে তা হঠাৎ করেই থেমে যেতো। এগুলো আসলে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল। শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছে, এই রক্তাক্ত ঘটনার পরেও কিছু স্থানীয় শিগগিরই নিয়োগ পেয়ে যাবে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “১০০+ শিক্ষার্থীর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্থানীয়দের সুবিধা দিতে হলে আগে চবি প্রশাসন পদত্যাগ করবেন।”
সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রবিবারের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন জোবরা গ্রামে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী ১নং গেট থেকে টহল শুরু করেছে এবং সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
চবি শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় দুষ্কৃতকারীদের ভয়ংকর হামলার কবল থেকে রক্ষা পাননি পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়িগুলোও। তাদের অভিযোগ, দারোয়ান ‘বাসেক’ হামলাকারীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমনকি প্রহরীদের সহযোগিতায় বহিরাগতরা রামদা, লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে এবং ক্যাম্পাসে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের সংঘর্ষ অশনি সংকেত বহন করছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে শিক্ষা পরিবেশ স্থিতিশীল হয় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থী এভাবে রক্তাক্ত না হয়।