
গাজীপুর জেলা, স্টাফ রিপোর্টারঃ রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের জানাকুর—একসময়ের শান্ত জনপদে এখন নেমেছে দীর্ঘশ্বাসের ভার। যে গ্রাম বহু বছর ধরে নীরবতা, আন্তরিকতা আর পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেই গ্রাম আজ স্থায়ী আতঙ্কে দুলছে একজন শনাক্ত ব্যক্তির আচরণে। সার্ভেয়ার মো. কবির হোসেন (৩৭), পিতা মো. আব্দুল সাহিদ—তার নাম উচ্চারিত হলেই এখন গ্রামের মানুষ থাকে আতঙ্কে।
কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ—বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ডিমার্কেশনের নথিতে কারচুপি, জমির মাপে এদিক সেদিক করা, জমি–দালালি, এবং সামান্য ধাক্কাধাক্কির ঘটনাকে নিজের ওপর হামলার নাটকে পরিণত করে গ্রামবাসীর নামে ৩২৩/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৫০৬/৩৪ ধারায় মিথ্যা মামলা দেওয়া। মামলা নং-১(১০)২০২৫।
অভিযোগ ওঠেছে—নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করে অন্যদের ফাঁসানো, ভয় দেখিয়ে আধিপত্য কায়েম করা, এবং গ্রামে বিভ্রান্তির আবহ ছড়িয়ে দেওয়া।
৩ অক্টোবর সকালে দেড় কাঠা জমির ওপর নির্মিত দেলোয়ার হোসেন তার পুরনো বাড়িতে যখন সংস্কারের কাজ করছিল তখন কবির, তার ভাই জাকির ও কয়েকজন স্বজন দেলোয়ারের বাড়িতে হামলা করেন। বাড়ি ভাঙতে থাকেন। দেলোয়ার হোসেনের দেড় কাঠার বাড়ির পিছন দিয়ে রাস্তা গেছে। আগে রাস্তার প্রস্থ ছিল মাত্র চার ফিট। দেলোয়ার তাঁর দেড় কাঠা জমি থেকে দেড় ফিট জায়গা ছাড়েন; এরপর মাটির মক্তবঘর ভাঙা হলে মসজিদ পক্ষ থেকেও ছাড়ে দেড় ফিট। এভাবে এখন সাত ফিটের রাস্তা বিদ্যমান।
তারপরও কবিরের দাবি—এই সাত ফিট রাস্তা তার আধিপত্যের জন্য যথেষ্ট নয়। দেলোয়ারের বাড়ি ভেঙে দিয়েও তাকে ১০ ফিট রাস্তা দিতেই হবে। না হলে আক্রমণের পাশাপাশি আরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে বলে কবির হোসেন গ্রামবাসীকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনার পরই গ্রামে ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হলে যুবসমাজ এগিয়ে আসে, উত্তেজনা সামাল দেয়। কিন্তু ঘটনার পর মুহূর্তেই কবির নিজের মাথায় জখমের নাটক সাজিয়ে গ্রামবাসীর ওপর গুরুতর ধারার মামলা দিয়ে দেন—এ অভিযোগে ক্ষোভে উত্তাল হয় গ্রাম।
জানাকুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও মাদরাসার প্রবীণ মতওয়াল্লী শেখ আলী আজম গফুর বলেন,
“গ্রামের কেউ কবিরকে আঘাত করেনি। স্বাভাবিক ধাক্কাধাক্কি ছাড়া কিছু হয়নি। সে নিজের মাথা নিজেই কেটে আমাদের নামে মামলা দিলো। বলে—টাকার গরমে আইন-আদালত কেনা যায়। আমরা আতঙ্কে দিন কাটাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান হোসেন বলেন, “মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার মতো কোনো সংঘর্ষই ঘটেনি। ধাক্কা ধাক্কি হয়েছে। শত মানুষ সাক্ষী। আমার ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাল। আরও মিথ্যা মামলার হুমকি দিচ্ছে।”
কবিরের চাচা আব্দুস সামাদ বলেন, “রাস্তা করার জন্য তেঁতুল গাছ কেটে জায়গা দিলাম। এখন নিজের বাড়ি তুলতে গেলে কবির কাজ বন্ধ করে দেয়; বলে ১০ ফিট না হলে হবে না। উল্টো আমাকে ও আমার ছেলেকে হুমকি দিচ্ছে।”
দেলোয়ার হোসেনের বলেন “২৫ বছর ধরে এই জমির মালিক আমি। আমার ২৫ বছরের পুরনো বাড়ি ভাঙতে হবে কেন? তার ওপর আমাকে মামলার আসামি বানালো। আরও মামলার হুমকি দিচ্ছে-আমরা তাহলে কোথায় যাব?”
এমরান হোসেন বলেন, “আগে রাস্তা ৪ ফিট ছিল। দেলোয়ার সাহেব দেড় কাঠা থেকে দেড় ফিট ছাড়লেন। মক্তব ভাঙলে মসজিদ কর্তৃপক্ষও দেড় ফিট দিল। এখন রাস্তা ৭ ফিট। এটি সরকারি রেকর্ডভুক্ত রাস্তা নয়—রেকর্ডভুক্ত রাস্তা থেকে পশ্চিমে যাওয়া পার্শ্বরাস্তা মাত্র। তারপরও আমার নামে মিথ্যা মামলা দিল। আরও বলছেআরেকটা মামলা দিয়ে দেবে। আমি তার বিচার চাই।”
গ্রামবাসীর দাবি—একজনের ব্যক্তিগত আধিপত্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে ক্রমে নষ্ট হচ্ছে শান্ত পরিবেশ; বিভ্রান্ত হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও। কবির সম্প্রতি নিজেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–র কর্মী বলে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ। তবে জেলা জামায়াতের আমীর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম স্পষ্টতই জানান “কবির আমাদের দলের কেউ নন। অন্যায়কারী কখনো আমাদের সদস্য হতে পারে না।”
জেলা জামায়াতের তরবিয়াত সেক্রেটারি মো. মাহমুদুল্লাহ সরেজমিন পরিদর্শনের পর মন্তব্য করেন “কবিরের কর্মকাণ্ড সমাজ বিধ্বংসী। আমরা নিরীহ মানুষের পাশে আছি।” রাজনৈতিক বিভ্রান্তির চাপ কমলেও সমস্যার মূল রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই।
কবিরের বিচার দাবি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চেয়ে গ্রামবাসী বিপুল স্বাক্ষর যুক্ত অভিযোগপত্র গাজীপুর পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক এবং অনুলিপি জয়দেবপুর থানার ওসি তৌহিদ আহম্মেদ এর কাছে জমা দিয়েছেন। তারা দাবি করছেন-মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং গ্রামের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যাবশ্যক।
জয়দেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তৌহিদ আহম্মেদ বলেন,“মামলা রেকর্ড হয়েছে, তদন্ত চলছে।”কিন্তু গ্রামের মানুষ চান—“চলছে” নয়, দ্রুত ও স্বচ্ছ ফলাফল। এদিকে জানাকুরের প্রবীণরা বলেছেন—“কবির শান্তি চায় না; আধিপত্য চায়।” এ অবস্থায় গ্রামবাসী কবির ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দাঁড়ায়—একজনের আচরণ কি পুরো গ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সুশৃঙ্খলতাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে? প্রশাসন কি কেবল মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপে জানাকুরে শান্তি ফিরিয়ে আনবে?
সার্বিক বিষয়ে কবির হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।