
মোঃ ফরহাদ, স্টাফ রিপোর্টারঃ আবুুল কাশেমের বয়স এখন সত্তরের ঘরে। এই বয়সে এখনো দিব্যি চলাফেরা করতে পারেন। মসজিদে নামাজ পড়তে যান, বিপদে-আপদে প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু আবুল কাশেমের আক্ষেপ হলো, জাতীয় পরিচয়পত্রে নথি অনুযায়ী তিনি মৃত।
নিজেকে জীবিত পরিচয় ফিরে পেতে বছরের পর বছর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন তিনি। কিন্তু এখনো ভোটার তালিকায় জীবিত হিসেবে নিজের নাম পুনর্বহাল করতে পারেননি। তাই আটকে গেছে বয়স্ক ভাতার টাকা। জীবন সায়াহ্নে এসে আবুল কাশেমের প্রশ্ন—‘আর কতদিন ঘুরলে জীবিত হইমু?’
আবুল কাশেমের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত মাঈন উদ্দিনের ছেলে।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েন আবুল কাশেম। তাকে জানানো হয়, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। পরে উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ২০১৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জে স্থানান্তরের পর তার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এরপর থেকেই নিজের জীবিত থাকার প্রমাণ দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের চেষ্টা করছেন তিনি। একাধিকবার আবেদন করেও কোনো সমাধান পাননি বলে দাবি তার পরিবারের।
আবুল কাশেমের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা ট্যাহা (টাকা) বয়স্ক ভাতা পাইতাম। হেইডাও বন্ধ কইরা দিছে। আমি নাকি মইরা (মরে) গেছি! বাঁইচা থাকতেও আমারে মরা দেখাইছে, এইডা কেমনে মাইনা লই? মেম্বার-চেয়ারম্যানের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলি (তলা) ছিঁড়া গেছে। আর কত দিন ঘুরলে জীবিত হইমু?
উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে আবুল কাশেম বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তরিত হন। ওই বছরই তিনি ‘মারা গেছেন’ উল্লেখ করে আজিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি তার মৃত্যুসনদ চেয়ে আবেদন করেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের সই করা পত্রের ভিত্তিতে তাকে ‘মৃত’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার ভোটার পরিচয়পত্রের তথ্যও কর্তন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আবুল কাশেম আমাদের এলাকার বড় ভাই। তিনি সবসময় আমাদের চোখের সামনেই আছেন। আজও একসঙ্গে চা খেয়েছি। কয়েক বছর আগে শুনলাম, তিনি নাকি মারা গেছেন। আমরা কবর দিলাম না, জানাজা পড়লাম না, তাহলে তিনি মারা গেলেন কীভাবে?’
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. বাহাউদ্দিন বলেন, ‘মৃত হিসেবে নথিভুক্ত থাকায় আবুল কাশেমের বয়স্ক ভাতা স্থগিত করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি নির্বাচন কার্যালয় সমাধান করবে। পরিচয়পত্রে জীবিত হিসেবে তথ্য সংশোধন হলে আবেদনের মাধ্যমে তাকে আবারও বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা যাবে।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন তামান্না রশিদ। তিনি বলেন, ‘আবুল কাশেমের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভোটার এলাকা স্থানান্তরের পর বরিশালের বাবুগঞ্জে তার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। ওই উপজেলার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করতে হবে। সেখানে যোগাযোগ করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।’
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জীবিত একজন মানুষকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী মৃত দেখানো দুঃখজনক। আবুল কাশেমকে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে পাঠালে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তার পরিচয় যাচাই করা হবে। জেলা কার্যালয় থেকে সমাধান করা সম্ভব হলে তা করা হবে। অন্যথায় দ্রুত কীভাবে তথ্য সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।’