সওকত হোসাইন,গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি: শ্রীপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তির জামায়াতে যোগদান, রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বাঁক নতুন বাস্তবতা, নতুন বার্তা..
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের দলজোড় গ্রামে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম হয়েছে। সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। ২২ অক্টোবর দুপুরে ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৩৯ জন নতুন কর্মী দলে শামিল হন। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিএনপির সাবেক সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এ যোগদান প্রমাণ করে যে, রাজনীতির প্রথাগত সীমারেখা আজ ভাঙছে। মানুষ ধর্ম ও পুরনো দলের পরিচয় পেছনে ফেলে নতুন আস্থার জায়গা খুঁজছে। রাজনীতিতে নৈতিকতা ও জনসম্পৃক্ততা চাইছে জনগণ। জামায়াত সেখানে এক নতুন সম্ভাবনা হিসেবে হাজির হচ্ছে। এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য এক নতুন চিন্তার সূচনা হতে পারে।
ভিন্নধর্মাবলম্বীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ- অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি ওয়াকিল হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন ওয়ার্ড সেক্রেটারি হাফেজ আল আমিন। নতুন কর্মীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় এবং দলীয় আদর্শ, কর্মপন্থা ও সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, মানুষ ধর্ম নয়, আজ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক শুদ্ধতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে। এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির দরজা খুলে দিতে পারে।
নেতৃত্বের বক্তব্যে উদার রাজনীতির বার্তা- প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গাজীপুর জেলা আমীর ড. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “আজকের এই ঐতিহাসিক যোগদান প্রমাণ করে জামায়াতে ইসলামী এখন সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।” এ বক্তব্য শুধু দলের পক্ষে প্রচারণা নয়, বরং উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা বহন করে। বক্তারা বারবার এক কথা বলেন-জামায়াত বিভাজন নয়, বরং ঐক্যের রাজনীতি চায়। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে বিভেদ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, সেখানে এই বার্তা আশা জাগানিয়া।
সংগঠনের প্রসার নয়, মূল্যবোধের বিস্তার- অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান খান, শ্রীপুর উপজেলা আমীর মাওলানা নুরুল ইসলাম, ও সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ। তাঁরা বলেন, “নতুন নেতৃত্ব ও কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।” কিন্তু এই শক্তি সংখ্যায় নয়, আদর্শে নিহিত। বক্তারা জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। দলীয় পরিধি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কল্যাণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন নেতৃবৃন্দ। বক্তৃতাগুলোতে রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কমিটি গঠনে তৃণমূলকে গুরুত্ব- অনুষ্ঠান শেষে দলজোড় গ্রামে জামায়াতে ইসলামীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। আব্দুস সাত্তারকে সভাপতি ও আনছার আলীকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির উদ্দেশ্যে বলা হয়-তারা যেন স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের কার্যক্রম সক্রিয় ও ফলপ্রসূভাবে পরিচালনা করে। এ উদ্যোগ প্রমাণ করে, জামায়াত তৃণমূলকে গুরুত্ব দিয়ে একটি কাঠামোগত রাজনীতি গড়তে চায়। নেতৃত্বকে ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে গ্রামীণ সমাজে বিস্তার ঘটানোই দলটির লক্ষ্য। এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং রাজনীতি হবে আরও প্রাসঙ্গিক।
জনসম্পৃক্ততা ছাড়া আস্থা পাওয়া অসম্ভব- জামায়াত নেতারা বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে জনসেবা ও নৈতিক রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। একদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা, অন্যদিকে ন্যায়ের রাজনীতি ও সেবার অভাব-এই দুইয়ের মাঝে নতুন করে ভরসা তৈরির জায়গা হতে পারে জামায়াত। তবে শুধু বক্তব্যে নয়, মাঠপর্যায়ে সেই জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করলেই তা টেকসই হবে। মানুষ এখন আর মুখের কথা বিশ্বাস করে না; চায় কাজের প্রমাণ। জামায়াত যদি তা দিতে পারে, তবে এই নতুন সদস্যরা সংগঠনের আসল শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
রাজনীতির চেহারায় বদলের আভাস- এই যোগদান অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় যে বার্তাটি উঠে এসেছে, তা হলো-মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসছে। তারা আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করছে না। মানুষ এখন এমন প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে, যেখানে নিজের বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং মূল্যবোধের জায়গা থাকে। শ্রীপুরের দলজোড় গ্রামে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের যোগদানের ঘটনা রাজনীতির সেই পরিবর্তিত মুখেরই প্রতিচ্ছবি। এক সময় যারা জামায়াতকে শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের রাজনৈতিক সংগঠন ভাবতেন, আজ তারাই স্বেচ্ছায় সেখানে যোগ দিচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
আস্থা ফিরে পেতে হলে চাই কাজের রাজনীতি- নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে বলেন, "মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কথার রাজনীতি নয়, চাই কাজের রাজনীতি।" জামায়াত যদি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়, তাহলে তারা কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং আদর্শিক বিকল্প হিসেবেও সামনে আসতে পারে। নতুন প্রজন্ম যারা রাজনীতিতে মূল্যবোধ খোঁজে, তাদের কাছে এটি গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। তবে এ পথ সহজ নয়। দীর্ঘ সময়ের চর্চা, ত্যাগ ও নিষ্ঠাই হতে পারে জামায়াতের প্রকৃত শক্তি। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা সেই পথে যাত্রা শুরু করলো বলেই মনে হয়।
রাজনৈতিক চেতনার নবজাগরণ- শ্রীপুরের দলজোড় গ্রামের এই যোগদান অনুষ্ঠান নিছক একটি দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর ঘটনা নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক চেতনার নবজাগরণ। এখানে ধর্ম, পুরনো দলের আনুগত্য কিংবা পরিচয়ের বাইরে গিয়ে মানুষ একটি মূল্যবোধভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিচ্ছে। এ ঘটনাকে যদি দল, মিডিয়া ও সমাজ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে, তাহলে এটি হতে পারে আগামীর রাজনীতির পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশে রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের কল্যাণে ফেরে, তাহলে এই ধরনের ঘটনাই হবে ভবিষ্যতের মাইলফলক।
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম।