মো. মাকছুদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কুমিল্লা জেলা শুধু প্রশাসনিক বা ভৌগোলিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের দিক থেকেও সমৃদ্ধশালী। প্রাচীনকালের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কুমিল্লা সুপরিচিত ছিল। একদিকে লালমাই-ময়নামতি পাহাড় , অন্যদিকে নদ-নদী, খাল-বিল—সব মিলিয়ে কুমিল্লা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল ভাণ্ডার। কুমিল্লার ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শালবন বিহার, কুতুব মিন্দপ, আনন্দ বিহারসহ অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন এখনো অতীতের বৌদ্ধ সভ্যতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ৭ম থেকে ১২শ শতকের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের স্থাপত্যকলা ও জীবনযাত্রার প্রতিফলন। কুমিল্লা ছিল নজরুল, কাজী দেবেন্দ্রনাথ, সত্যেন সেন, লুতফর রহমান, এবং সঙ্গীতশিল্পী শামসুল হকসহ অসংখ্য সাহিত্যিক ও শিল্পীর জন্মভূমি। লালনগীতি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি গানের সাথে কুমিল্লার লোকসঙ্গীত আজও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লার অবদান গৌরবোজ্জ্বল। এখানকার মুক্তিকামী মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দেবিদ্বার, ব্রাহ্মণপাড়া, দাউদকান্দি ও মুরাদনগরসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম আজও স্মরণীয়। কুমিল্লার খ্যাতনামা "রসমালাই" এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন। এছাড়া কুমিল্লার হাঁস-মুরগির মাংস ও দেশি খাবার সমানভাবে পরিচিত। হস্তশিল্পে খ্যাত কুমিল্লার “খিদিরপুর তামার কাজ” ও মৃৎশিল্পও ঐতিহ্যের অংশ। কুমিল্লার গ্রামীণ মেলা, নৌকা বাইচ, পিঠাপুলি উৎসব, বৈশাখী মেলা এবং ওসমানী নগরের হিন্দু-মুসলিম মিলনমেলা এখানকার বহুমুখী সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়—এসব প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষারই নয়, সংস্কৃতি চর্চারও কেন্দ্রবিন্দু। কুমিল্লার ঐতিহ্য কেবল প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও খাদ্য ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন। প্রাচীন সভ্যতার ধারক কুমিল্লা আজও আধুনিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।